মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৩৪ অপরাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম ::
“জেলের দেয়ালের ভেতরের অভিজ্ঞতা: এক শিক্ষকের হৃদয়বিদারক বাস্তবতা, বেঁচে থাকার লড়াই ও জীবনের গভীর শিক্ষা”–এম নজরুল ইসলাম খান নারীকণ্ঠ পত্রিকার নিয়মিত মাসিক সাহিত্য আড্ডা  সতস্ফূর্ত উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত | Manob Somoy সিএমপি’র ডিবি(উত্তর) বিভাগের অভিযানে ০১টি ৭.৬৫ মডেলের বিদেশি পিস্তলসহ আসামি গ্রেফতার আজকের মানব সময় আইন আদালতে প্রকাশিত হলো এ্যাডভোকেট শাহানারা খাতুন (শানু)’র “রেকর্ড সংশোধন মামলা” নিয়ে লেখা বিশেষ প্রতিবেদন আজকের মানব সময় সাহিত্যে প্রকাশিত হলো নীলিমা আক্তার নীলার লেখা “দুই বছর পর” বিশেষ ফিচারটি হরেকৃষ্ণপুরে একটি আশ্রয়কেন্দ্র এখন সময়ের দাবি | Manob Somoy দক্ষিণ হালিশহরে নবীন – প্রবীণদের ঈদ পুনর্মিলনীও গুণীজন সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত | Manob Somoy শিপিং সেক্টরে নতুন বাজার সৃষ্টিতে নাবিকগণ দূত হিসেবে কাজ করবে – নৌপরিবহন মন্ত্রী ৩৮ নং ওয়ার্ডে উন্নয়ন ফোরাম আয়োজিত বিনামূল্যে হাম ও বসন্তের টিকা-ঔষধ বিতরণ কর্মসূচি উদ্বোধন আজকের মানব সময় সাহিত্যে প্রকাশিত হলো ড. মোঃ আজিজুল হক এর লেখা ” বাঙালি জীবনে পহেলা বৈশাখ”

“জেলের দেয়ালের ভেতরের অভিজ্ঞতা: এক শিক্ষকের হৃদয়বিদারক বাস্তবতা, বেঁচে থাকার লড়াই ও জীবনের গভীর শিক্ষা”–এম নজরুল ইসলাম খান

  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬, ১১.০২ এএম
  • ৩ বার পঠিত

নিজস্ব প্রতিবেদক :
তিনি একজন শিক্ষক—মানুষ গড়ার কারিগর। একজন সংগঠক, যিনি সমাজকে আলোর পথে এগিয়ে নিতে স্বপ্ন দেখতেন প্রতিদিন। তার জীবন ছিল শৃঙ্খলা, আদর্শ আর শিক্ষার আলোয় ভরা। কিন্তু হঠাৎ করেই ভাগ্যের নির্মম পরিহাস তাকে ঠেলে দেয় এক সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতে—কারাগারের নির্দয় বাস্তবতায়।
জেলের গেট পেরোনোর সেই প্রথম মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় তার নতুন এক পরিচয়। তিনি আর সেই সম্মানিত শিক্ষক নন; হয়ে যান একটি সংখ্যা, একটি কেস কার্ড, একটি পরিচয়হীন “হাজতি”। বাইরের পৃথিবীর পরিচিত মুখ, পরিবারের উষ্ণতা, স্বাধীনতার স্বাদ—সব যেন মুহূর্তেই দূরে সরে যায়। হাতে ধরিয়ে দেওয়া একটি ছোট্ট কার্ডই হয়ে ওঠে তার নতুন পরিচয়, বেঁচে থাকার শর্ত এবং সীমাবদ্ধতার প্রতীক।
কারাগারের জীবন শুরু হয় “আমদানি” দিয়ে—একটি শব্দ, যা শুধু প্রবেশ নয়, বরং পরিচয় হারানোর বেদনাকে চিহ্নিত করে। এরপর একে একে সামনে আসে জেলের নিজস্ব ভাষা ও কাঠামো—“কেস কার্ড”, “পিসি কার্ড”, “রাইটার”, “মেট”, “পাহারাদার”, “কারারক্ষী”, “জমাদার”—এসব শুধুই পদ বা শব্দ নয়; এগুলো এক কঠোর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত বাঁধা নিয়মে, প্রতিটি শ্বাস নিরীক্ষিত।
ওয়ার্ডে প্রবেশের পর বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গাদাগাদি করে থাকা মানুষ, মেঝেতে ঘুম, সামান্য জায়গার জন্য নীরব প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে এক অস্বস্তিকর, কঠিন পরিবেশ। ঘুমহীন রাত, মশার কামড়, ঘামে ভেজা শরীর আর পানির জন্য দীর্ঘ লাইন—এই ছোট ছোট কষ্টগুলোই হয়ে ওঠে প্রতিদিনের বেঁচে থাকার সংগ্রাম। দিনের পর দিন কানে ভেসে আসে একটাই শব্দ—“গণনা! ফাইল! ফাইল!”সকাল, বিকাল, রাত—বারবার দাঁড় করিয়ে গণনা করা হয়। সামান্য ভুল মানেই প্রশ্ন, কখনো শাস্তি। এই নিয়মের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে ভয়, শৃঙ্খলা এবং এক নিঃশব্দ শাসনব্যবস্থা।
খাবার আসে নির্দিষ্ট সময়ে—ভাত, ডাল, কখনো রুটি। তাতে স্বাদের কোনো উপস্থিতি নেই; এটি শুধু বেঁচে থাকার প্রয়োজন মেটায়। ক্যান্টিন থাকলেও তা সবার নাগালে নয়। সামর্থ্যবানরা কিছুটা স্বস্তি পেলেও, অনেকেই নীরবে বাস্তবতার সাথে মানিয়ে নেয়।
মেডিকেল সেবা, বাথরুম, ওয়াশরুম—সবকিছুতেই সীমাবদ্ধতা। প্রতিটি কাজের জন্য অপেক্ষা, লাইনে দাঁড়ানো, নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম ও জাগরণ—সবই কঠোর নিয়ন্ত্রণে। এই বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে একসময় তার মনে প্রশ্ন জাগে—তিনি কি সত্যিই বেঁচে আছেন, নাকি কেবল টিকে আছেন? তবে শারীরিক কষ্টের চেয়েও গভীর ছিল মানসিক যন্ত্রণা। পরিবার, সন্তান, প্রিয়জন—সব সময় তার মনে ভেসে উঠত। সপ্তাহে কয়েক মিনিট কথা বলার সুযোগ কিংবা নির্দিষ্ট সময়ে সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎ—এই ক্ষণিক মুহূর্তগুলোই হয়ে উঠত তার বেঁচে থাকার প্রধান শক্তি। অজান্তেই চোখ ভিজে উঠত, কিন্তু সেই অশ্রু লুকিয়ে রাখাই ছিল নিয়ম।
এই কঠিন বাস্তবতার মাঝেই তিনি দেখতে পান মানবতার অন্য এক চিত্র। একদিন এক প্রবীণ হাজতিকে নীরবে অশ্রুসজল চোখে খাবার খেতে দেখে তিনি স্তব্ধ হয়ে যান। পাশে এক নতুন বন্দির থালা প্রায় খালি। সেই দৃশ্য তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তিনি উপলব্ধি করেন—
মানুষ কীভাবে অন্যায়ের শিকার হয়, আবার কীভাবে প্রতিকূলতার মাঝেও সহনশীলতা ও মানবিকতা ধরে রাখে। কারাগারের এই তিন মাস তার জীবনে শুধু কষ্টের নয়, বরং এক গভীর শিক্ষার অধ্যায় হয়ে ওঠে। এখানে তিনি মানুষকে নতুনভাবে চিনেছেন—নিরাবরণ সত্যে। ভালো-মন্দ, সহানুভূতি-নিষ্ঠুরতা—সবকিছুই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তার চোখে।
অবশেষে মুক্তি আসে। তিনি ফিরে পান তার স্বাধীনতা, তার পরিচয়। কিন্তু জেলের দেয়ালের গন্ধ, নিঃশব্দ রাতের কান্না, সহবন্দিদের চোখের ভাষা—এসব স্মৃতি তার মন থেকে কখনো মুছে যায় না।
তিনি চান, মানুষ শুধু এই কষ্টের গল্প না জানুক—
বরং উপলব্ধি করুক স্বাধীনতার মূল্য, ন্যায়বিচারের গুরুত্ব এবং মানুষের ভেতরের অজানা শক্তিকে।
কারণ—জেলের দেয়ালে ঝরে পড়া অশ্রু শুধু একজন মানুষের নয়;এটি পুরো সমাজের বিবেকের নীরব প্রতিচ্ছবি।
(লেখক: শিক্ষক ও সাংবাদিক)

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved  2021 manobsomoy
Theme Developed BY ThemesBazar.Com