
মানব সময় সাহিত্য ডেস্ক :
আমার শৈশব কেটেছে এমন এক গ্রামে, যেখানে প্রকৃতির রূপ যেমন ছিল অপরূপ, তেমনি মানুষের জীবন ছিল অনিশ্চয়তা, কুসংস্কার আর অপচিকিৎসার করাল ছায়ায় ঢাকা নাছির মাঝি গ্রাম। আজ পেছন ফিরে তাকালে মনে হয়—আমরা যেন একেকজন জীবন্ত সাক্ষী, যারা সভ্যতার অন্ধকার অধ্যায় পেরিয়ে আলোর পথে আসার ইতিহাস নিজের চোখে দেখেছি।
শৈশবে আমি গ্রামগঞ্জে বহু মহামারী আর অপচিকিৎসার ভয়াবহ চিত্র সচক্ষে দেখেছি। কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজব্যবস্থার কারণে অকালে প্রাণ হারাতে হতো সহজ-সরল, নিষ্পাপ গ্রাম্য মানুষদের। যদিও শহরে তখন আধুনিক চিকিৎসার সীমিত প্রচলন শুরু হয়েছিল, কিন্তু গ্রাম ছিল সে আলো থেকে বহু দূরে—বঞ্চিত, অবহেলিত।
আমাদের গ্রামে তখন কুকুর, বিড়াল, শেয়াল, বেজি, ইঁদুরের কামড় মানেই প্রায় নিশ্চিত মৃত্যু। জলাতঙ্ক—একটি ভয়ংকর নাম, যার পরিণতি ছিল শতভাগ মৃত্যু। অথচ এই রোগের প্রকৃত চিকিৎসা না জেনে গ্রামের মানুষ ওঝা-বৈদ্যর শরণাপন্ন হতো। কলাপড়া, ডাবপড়া খাইয়ে, ঝাড়ফুঁক করে আশ্বাস দেওয়া হতো—
“কিছু হবে না, রোগী ভালো হয়ে যাবে।”
কিন্তু বাস্তবতা ছিল নিষ্ঠুর। কয়েকদিন পরই আক্রান্ত ব্যক্তি অদ্ভুত আচরণ করতে শুরু করত—পাগলের মতো চিৎকার, কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ করা, মানুষকে কামড়াতে চাওয়া, পানির দিকে তাকিয়েই আতঙ্কে কেঁপে ওঠা। এই শৈশবের দৃশ্যগুলো আজও আমার চোখে ভাসে।
আমি তখন ক্লাস ফোরে পড়ি। যে প্রাইমারি স্কুলে পড়তাম, তার পাশেই ছিল হাসেম কারী সাহেবদের বাড়ি—স্কুলের প্রতিষ্ঠাতাদের বসতভিটা। একদিন ক্লাস চলাকালীন পাশের বাড়ি থেকে ভেসে এলো হৃদয়বিদারক কান্না। আমরা কয়েকজন সহপাঠী ছুটে গেলাম সেখানে।পল্লী চিকিৎসক ছাইফুল্লা ডাক্তারের ছেলেে হৃদয়বিদারক চিৎকার করছে পাগলের মত। যা দেখলাম, তা আমাদের শিশুমনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল।
২০–২৫ বছরের এক যুবককে ঘরের খুঁটির সাথে হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। সে কুকুরের মতো চিৎকার করছে, মানুষকে কামড়াতে চাইছে। জানতে পারলাম, কয়েক মাস আগে তাকে কুকুরে কামড়েছিল। ওঝার কলাপড়ায় ভরসা করে সময় নষ্ট করায় শেষ পর্যন্ত জলাতঙ্কে তার মৃত্যু হয়।
এমন আরেকটি ঘটনা—বালিকা স্কুলের পাশে মেস্তুরি বাড়ির রশিদ মিস্ত্রির ছেলে বেজির কামড়ে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারায়। নাছির মাঝি এলাকার মজু শিকদার বাড়ির আঠারো বছরের মোঃ হারুন—গরুকে কুকুরে কামড়ানোর পর সেই গরুর দাঁতের কামড়ে নিজেও জলাতঙ্কে আক্রান্ত হয়ে করুণ মৃত্যু বরণ করে। জমাদার বাড়ির হায়দার আলী—বেজির কামড়ে অকালে ঝরে যায়। গ্রাম যেন এক মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছিল।
শুধু জলাতঙ্ক নয়—বিষাক্ত সাপের দংশনেও গ্রামগঞ্জে অগণিত মানুষ মারা গেছে। হাসপাতালে না গিয়ে ওঝা-বৈদ্যর কাছে যাওয়ায় বিষ সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ত। অপচিকিৎসাই হয়ে উঠত মৃত্যুদূত।
আমাদের বাড়ির পাশে নুর বকশ ফরাজী বাড়ি—যাকে সবাই তেলিবাড়ি বলত। এই বাড়ির আবু ইউসুফ সাহেব পুলিশ অফিসার ছিলেন। একসময় গ্রামে কলেরা ও ডায়রিয়া মহামারী আকার ধারণ করে। গভীর নলকূপ ছিল না, মানুষ পুকুর-খাল-বিলের পানি পান করত। সেই সময় আবু ইউসুফ সাহেবের দুই ছেলে—১২–১৩ বছরের জুয়েল ও কামরুল—কলেরায় আক্রান্ত হয়।
তখনকার কুসংস্কার ছিল আরও ভয়াবহ—ডায়রিয়া হলে পানি খাওয়ানো যাবে না! তাদের মা ছেলেদের পানি দিতে নিষেধ করেন, কলসিও লুকিয়ে রাখেন। দুই ভাই জানালার ফাঁক দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে শুধু একটু পানির জন্য মায়ের কাছে মিনতি করে।
“মা, তোমার আঁচল ভিজিয়ে একটু পানি দাও…”
কিন্তু পানিশূন্যতায় একে অপরকে জড়িয়ে ধরে তারা ঘরের মেঝেতেই নিথর হয়ে যায়। এক হৃদয়বিদারক মৃত্যু—যা আজও আমার মনে গভীর দাগ কেটে আছে।
আমার এক চাচী তার আট বছরের মেয়ে হাসনুর বেগমের শ্বাসকষ্টে কুনো ব্যাঙের ফুসফুস ও কলিজা কেটে জোর করে খাইয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত নিউমোনিয়ায় মারা যায় সেই নিষ্পাপ শিশুটি। আজও তার কাশির শব্দ যেন কানে বাজে।
শিশু বয়সে আরেকটি ভয়াবহ রোগ ছিল গুটি বসন্ত। এতটাই ছোঁয়াচে যে আক্রান্ত ব্যক্তির কাছে কেউ যেত না। লাশ ঘরে পড়ে পচে থাকত। কখনো কখনো একটি পরিবার সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত।
পরবর্তীতে গুটি বসন্তের টিকা আবিষ্কার মানবসভ্যতার এক যুগান্তকারী অধ্যায়। স্কুলে, বাড়িতে বাড়িতে স্বাস্থ্যকর্মীরা এসে ব্যথাযুক্ত সেই বহু সূঁচের টিকা দিতেন। জ্বর, পুঁজ—সব কষ্ট সয়ে মানুষ ধীরে ধীরে বেঁচে থাকার পথ খুঁজে পেল।
হাতে তৈরি স্যালাইন—এক মুঠো গুড় বা চিনি, এক চিমটি লবণ আর আধাসের পানি—এই সহজ জ্ঞান হাজার হাজার প্রাণ বাঁচিয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রচেষ্টায় মানুষ শিখল পরিষ্কার পানি পান করতে, স্যানিটেশন গড়ে তুলতে। গভীর নলকূপ বসলো, হ্যালোজেন ট্যাবলেট এলো, সভ্যতা ধীরে ধীরে গ্রামে পৌঁছালো।
আজ মানুষ জানে—কুকুর বা বেজির কামড় মানেই ভ্যাকসিন। জানে—ডায়রিয়ায় পানি জীবন। সভ্যতার পরিবর্তনের সাথে সাথে সেই ভয়াবহ মহামারীগুলো একে একে বিদায় নিয়েছে।
সম্প্রতি করোনা ছিল তেমনি এক মারাত্মক সংক্রামক রোগ। কিন্তু গণসচেতনতা, বিজ্ঞান আর সম্মিলিত উদ্যোগে মানুষ আবারও প্রমাণ করেছে—জ্ঞানই জীবনের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ।
এই সব অভিজ্ঞতা আমার দুরন্ত শৈশবের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমি দেখেছি মৃত্যু, দেখেছি অজ্ঞতা, আবার দেখেছি আলো। তাই আজ লিখে যেতে চাই—যেন আগামী প্রজন্ম জানে, আমরা কোন অন্ধকার পেরিয়ে আজকের এই আলোর পৃথিবীতে এসেছি।