
মানব সময় ডেস্ক :
বাংলাদেশ শিক্ষা বিস্তারে গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। প্রাথমিক স্তরে ভর্তি হার প্রায় সর্বজনীন, নারী শিক্ষায় দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে এবং উচ্চ শিক্ষায় প্রবেশাধিকারের সুযোগও বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে UNESCO এবং Asian Development Bank-এর বিশ্লেষণ স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে যে, এই অগ্রগতি মূলত সংখ্যাগত; শিক্ষার গুণগত মান এখনও আন্তর্জাতিক মানের নিচে রয়েছে। শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য কেবল অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয়। কার্যকর শিক্ষণ পদ্ধতি, দক্ষতা-ভিত্তিক পাঠদান, সুশাসন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং নির্ভরযোগ্য মূল্যায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য। বাস্তবে দেখা যায়, এই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে ঘাটতি বিদ্যমান, যা বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি নীরব সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সংখ্যার আড়ালে বাস্তবতা হচ্ছে
আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে একজন শিক্ষার্থী বাংলাদেশে গড়ে ১১ বছর পড়াশোনা করলেও তার শেখার দক্ষতা আন্তর্জাতিক মানে মাত্র ৬–৭ বছরের সমতুল্য। প্রাথমিক স্তরের প্রায় ৫০% শিক্ষার্থী সাবলীলভাবে পড়তে পারে না বা মৌলিক গণিতে দুর্বল। এটি একটি সুস্পষ্ট “learning crisis”, যা ভবিষ্যতের দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।
COVID-19 মহামারীর সময় দীর্ঘ সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার ফলে শিক্ষার ঘাটতি মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পায়, শিক্ষার্থীর ড্রপআউট হার বৃদ্ধি পায় এবং ডিজিটাল বৈষম্য তীব্র হয়। অনলাইন শিক্ষা চালু থাকলেও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে অধিকাংশ শিক্ষার্থী এর সুফল পায়নি। ফলে একটি বড় অংশ শিক্ষার্থী শিক্ষাগতভাবে পিছিয়ে পড়েছে, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অনিবার্য। শিক্ষাবিঘ্নের ধারাবাহিকতায়
বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতায় বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি ও শৈত্যপ্রবাহ নিয়মিত ঘটনা। এই কারণে অনেক সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে হয়। কিছু স্কুল আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়। ফলে নির্ধারিত শিক্ষাদিবস কার্যত কমে যায়। রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা
রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং পরিবহন সমস্যা শিক্ষার ধারাবাহিকতাকে ব্যাহত করে। শিক্ষার্থী উপস্থিতি কমে যায় এবং শ্রেণিকক্ষ কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়।
শিক্ষক সংকট ও দায়িত্বের চাপ
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকট, প্রশিক্ষণের অভাব এবং পেশাগত অনুপ্রেরণার ঘাটতি দীর্ঘদিনের সমস্যা। শিক্ষকদের উপর অতিরিক্ত প্রশাসনিক কাজ যেমন নির্বাচন, আদমশুমারি ও সরকারি জরিপ যুক্ত হওয়ায় তারা তাদের মূল দায়িত্ব—শিক্ষাদান থেকে বিচ্যুত হন। পরীক্ষানির্ভরতা ও শিক্ষার ব্যাঘাত
বছরের বড় অংশ বিভিন্ন পরীক্ষা পরিচালনার জন্য স্কুলগুলো ব্যবহার করা হয়। ফলে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হয় এবং শিক্ষার ধারাবাহিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
যদিও বছরে ২০০–২২০ দিন শিক্ষাদিবস নির্ধারিত থাকে, বাস্তবে কার্যকর ক্লাস হয় মাত্র ১২০–১৪০ দিন। অর্থাৎ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সময় বিভিন্ন কারণে হারিয়ে যায়, যা শিক্ষার মানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বহুমাত্রিক সংকট ও শিক্ষা সিদ্ধান্ত শিক্ষা নিয়ে যে সকল সিদ্ধান্ত সরকারকে নিতে হয় তার কারণও আছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা অনলাইন-অফলাইন পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত একাধিক কারণে নেওয়া হয়—জ্বালানি সংকট, বিদ্যুৎ ঘাটতি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবহন সমস্যা। এই বাস্তবতা নীতিনির্ধারকদের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। তবে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—শিক্ষা বন্ধ রাখা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর এবং এটি টেকসই সমাধান নয়। প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ ও আস্থার সংকট পাঠ্যপুস্তক বিতরণে বিলম্ব, সিলেবাস ও মূল্যায়নে অনিশ্চয়তা এবং ভর্তি নীতির ঘন ঘন পরিবর্তন অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। এটি শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমিয়ে দেয়।
টেকসই সমাধানের পথ রাষ্ট্রের করণীয় শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি শিক্ষকদের অপ্রাসঙ্গিক দায়িত্ব হ্রাস
দুর্যোগকালীন বিকল্প (hybrid) শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করা
পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য remedial শিক্ষা
অভিভাবকদের ভূমিকাপ্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা শিশুদের সৃজনশীল বিকাশে উৎসাহ প্রদান
শিক্ষার্থীদের করণীয় বোঝার মাধ্যমে শেখা
আত্মশিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে মনোযোগ দিয়ে শিক্ষার মান উন্নয়নে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
শিক্ষা কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নয়; এটি একটি জাতির মানসিক, নৈতিক, সৃজনশীল ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি নির্মাণের প্রধান মাধ্যম। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বিভিন্ন সংকটে পড়লেও এটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। যেকোনো সংকট মোকাবিলায় শিক্ষা বন্ধ না করে শিক্ষাকে সচল রাখার পথ খুঁজে বের করতে হবে। শিক্ষা এমন একটি শক্তি—যার মাধ্যমে একটি জাতি তার সব সংকট অতিক্রম করে টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারে।
(লেখক :চট্টগ্রাম মডেল স্কুল-এর প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষক, বাংলাদেশ সাংবাদিক ক্লাব-এর মহাসচিব)