
মোঃ আবদুল কাদের রাজু
আজ মহান স্বাধীনতা দিবস ও জাতীয় দিবস। দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গকারী শহীদ ও বীর সন্তানদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে জাতি উদযাপন করছে স্বাধীনতার ৫৬তম বার্ষিকী। ২৬শে মার্চ শুধু একটি তারিখ নয়, এটি বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়, সাহস, আত্মত্যাগ এবং মুক্তির অঙ্গীকারের প্রতীক।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর মাধ্যমে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর নির্মম গণহত্যা চালায়। সেই বর্বরতার প্রতিক্রিয়ায় ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরেই শুরু হয় বাঙালির সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, অগণিত মানুষের আত্মত্যাগ এবং প্রায় ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় চূড়ান্ত বিজয়।
স্বাধীনতার পেছনে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী। একই সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বৈষম্যমূলক শাসন জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রমনা রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ বাঙালি জাতিকে মুক্তির সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করে।
পরবর্তীতে ২৭শে মার্চ চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করেন, যা দেশজুড়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষকে যুদ্ধে অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে। জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধে সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ‘জেড ফোর্স’ গঠন করে সম্মুখযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। তাঁর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযানে অংশ নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তাঁর এই অবদান মুক্তিযুদ্ধকে সুসংগঠিত ও গতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আজকের দিনে রাষ্ট্রীয়ভাবে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করা হচ্ছে। ভোরে একত্রিশ তোপধ্বনির মাধ্যমে দিবসের সূচনা হয়। সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়।
সকালে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাভারের জাতীয় শহীদ স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পরে বীরশ্রেষ্ঠদের পরিবার, মুক্তিযোদ্ধা, বিদেশি কূটনীতিক, রাজনৈতিক নেতা এবং সর্বস্তরের মানুষ শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
সকাল সাড়ে ৭টায় জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে কুচকাওয়াজ ও বিমান প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত থাকেন। দিবসটি উপলক্ষে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও ভবনসমূহ সজ্জিত ও আলোকিত করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে বলেন, স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি, শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং প্রতিটি নাগরিকের মর্যাদা নিশ্চিত করা। তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, বীর উত্তমসহ সকল মুক্তিযোদ্ধা, নির্যাতিত মা-বোন এবং জাতির অবদান রাখা সকল মানুষের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বাণীতে বলেন, মহান স্বাধীনতা দিবস আমাদের নতুন করে সাহস, আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে। তিনি একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুও শুভেচ্ছা বার্তায় বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানিয়ে দুই দেশের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনের কথা উল্লেখ করেন।
দিবসটি উপলক্ষে জাতীয় দৈনিকগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করছে। বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বিভিন্ন বেসরকারি টিভি ও রেডিও চ্যানেলে প্রচারিত হচ্ছে বিশেষ অনুষ্ঠান। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন বিস্তারিত কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের জাহাজ চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা বন্দরে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। সদরঘাট, পাগলা ঘাট ও বরিশাল লঞ্চ টার্মিনালসহ বিভিন্ন নদীবন্দরে দর্শনার্থীরা এসব জাহাজ পরিদর্শনের সুযোগ পাচ্ছেন। এছাড়া চাঁদপুর ও মুন্সীগঞ্জেও কোস্টগার্ডের জাহাজ উন্মুক্ত রয়েছে।
দিবসটি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী একটি স্মারক ডাকটিকিট উন্মোচন করেছেন। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ফুটবল, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট ও কাবাডি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। দেশজুড়ে সিনেমা হলে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র বিনামূল্যে প্রদর্শন করা হচ্ছে এবং সরকারি-বেসরকারি জাদুঘরগুলো দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
শিশুদের বিনোদন কেন্দ্রগুলো খোলা রাখা হয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে আয়োজন করা হয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। পাশাপাশি মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও প্যাগোডাসহ সব ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত এবং দেশের অগ্রগতি কামনা করা হচ্ছে।
এছাড়া হাসপাতাল, কারাগার, এতিমখানা, পুনর্বাসন কেন্দ্র, প্রতিবন্ধী কল্যাণ কেন্দ্র ও বৃদ্ধাশ্রমে বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে “স্বাধীনতা পুরস্কার” প্রদান করা হয়, যা দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা। ১৯৭৭ সালে প্রবর্তিত এই পুরস্কার বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ প্রদান করা হয়ে থাকে।
মহান স্বাধীনতা দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা শুধু অর্জনের বিষয় নয়, বরং তা রক্ষা ও সমৃদ্ধ করার দায়িত্বও আমাদের সবার। এই চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।