
আমরা প্রতিদিন কত মানুষের সঙ্গে কথা বলি, কত মানুষের খোঁজ নিই, কত মানুষকে সান্ত্বনা দিই। কাউকে বলি, “মন খারাপ করো না, সব ঠিক হয়ে যাবে।” কাউকে বলি, “কোনো সমস্যা হলে আমাকে জানিও।” আবার কারও কষ্টের কথা শুনে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। কিন্তু কখনো কি একবারও ভেবে দেখি, যে মানুষটি প্রতিদিন অন্যের পাশে দাঁড়ায়, তার পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ আছে কি না?
পৃথিবীতে কিছু মানুষ আছে, যারা অন্যের মুখের সামান্য পরিবর্তন দেখেই বুঝতে পারে, তার মন ভালো নেই। প্রিয় মানুষের কণ্ঠে একটু নীরবতা শুনেই জিজ্ঞেস করে, “কী হয়েছে তোমার?” অথচ নিজের ভেতরে কত কথা জমে থাকলেও তারা কাউকে কিছু বলতে পারে না। অন্যের চোখের জল মুছিয়ে দিতে দিতে কখন যে নিজেদের অনুভূতিগুলো আড়াল করতে শিখে যায়, তা নিজেরাও বুঝতে পারে না।
আমরা প্রায়ই মানুষের হাসি দেখি, কিন্তু সেই হাসির পেছনের ক্লান্তিটুকু দেখতে শিখি না। কারও সুন্দর কথাগুলো শুনি, কিন্তু সেই কথাগুলো বলার আগে তার নিজের সঙ্গে কতবার লড়াই করতে হয়েছে, তা জানতে চাই না। আমরা ধরে নিই, যে মানুষটি সব সময় শক্ত থাকে, তার বুঝি কখনো দুর্বল লাগার অধিকার নেই। যে মানুষটি সবাইকে সাহস দেয়, তার বুঝি কখনো সাহসের প্রয়োজন হয় না।
অথচ মানুষ তো কোনো যন্ত্র নয়। যার অনুভূতি নেই, যার ক্লান্তি নেই, যার একটু আশ্রয় চাওয়ার প্রয়োজন নেই। অন্যকে সান্ত্বনা দেওয়া মানুষটিরও কখনো সান্ত্বনা দরকার হয়। সবার কথা মন দিয়ে শোনা মানুষটিরও কখনো এমন কাউকে প্রয়োজন হয়, যে কোনো উপদেশ না দিয়ে শুধু তার কথাগুলো শুনবে।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, অনেক সময় আমরা মানুষের মূল্য বুঝতে শিখি তার অনুপস্থিতিতে। যত দিন কেউ আমাদের খোঁজ নেয়, তত দিন সেই খোঁজ নেওয়াকে স্বাভাবিক মনে করি। যত দিন কেউ আমাদের ভুল বুঝেও সম্পর্কটা ধরে রাখার চেষ্টা করে, তত দিন তার ধৈর্যকে দুর্বলতা ভাবি। যত দিন কেউ আমাদের দুঃসময়ে পাশে থাকে, তত দিন মনে করি, সে তো থাকবেই।
কিন্তু কোনো একদিন সেই মানুষটিও যখন চুপ হয়ে যায়, আর আগের মতো খোঁজ নেয় না, তখন আমরা অবাক হয়ে প্রশ্ন করি, “মানুষটা বদলে গেল কেন?”
আমরা কি কখনো ভেবে দেখি, সে হয়তো বদলে যায়নি; হয়তো বারবার নিজের অনুভূতিকে উপেক্ষা করতে করতে একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। হয়তো তারও একদিন মনে হয়েছে, সবার জীবনে তার উপস্থিতি প্রয়োজনীয়, কিন্তু তার নিজের অনুভূতিগুলোর জন্য কোথাও কোনো জায়গা নেই।
তবে নীরব মানুষ মানেই কষ্টে থাকা মানুষ নয়, আর সব হাসির আড়ালেও দুঃখ লুকিয়ে থাকে না। তাই কাউকে দেখে অনুমান করার চেয়ে তার কথা শোনা, তার অনুভূতিকে সম্মান করা এবং প্রয়োজনে পাশে থাকার প্রস্তাব দেওয়াই বেশি জরুরি।
আমরা যদি সত্যিই একটি সুন্দর সমাজ গড়তে চাই, তাহলে শুধু বড় বড় মানবতার কথা বললেই হবে না। মানবতাকে জায়গা দিতে হবে আমাদের প্রতিদিনের ছোট ছোট আচরণে। পরিবারের সেই মানুষটির খোঁজ নিতে হবে, যে সবার প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে নিজের কথা ভুলে যায়। বন্ধুটিকে জিজ্ঞেস করতে হবে, যে সব সময় আমাদের কথা শোনে, তার নিজেরও কিছু বলার আছে কি না। আর অপরিচিত কাউকে বিচার করার আগে মনে রাখতে হবে, তার জীবন সম্পর্কে আমরা হয়তো খুব সামান্যই জানি।
কারও জীবনে বড় কিছু হয়ে ওঠার জন্য সব সময় বড় কোনো কাজ করতে হয় না। কখনো সময়মতো করা একটি ফোন, আন্তরিকভাবে শোনা কয়েকটি কথা, কিংবা কোনো প্রত্যাশা ছাড়া পাশে থাকার আশ্বাসও একজন মানুষের কাছে অনেক মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে।
আমার মনে হয়, পৃথিবীর সব মানুষকে সুখী করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। প্রত্যেকের সব সমস্যার সমাধানও আমাদের হাতে নেই। কিন্তু আমরা চাইলে অন্তত এমন একজন মানুষ হতে পারি, যার কাছে অন্য কেউ নিজের কথা বলতে গিয়ে ছোট বোধ করবে না; যার কাছে দুর্বলতা প্রকাশ করতে লজ্জা পাবে না; যার কাছে নিজের কষ্টটুকু বলার জন্য নিখুঁত শব্দ খুঁজতে হবে না।
কারণ মানুষের জীবনে সব সময় সমাধান দেওয়ার মতো মানুষের প্রয়োজন হয় না; কখনো কখনো এমন একজন মানুষের প্রয়োজন হয়, যে মন দিয়ে শুনবে এবং বুঝতে চেষ্টা করবে।
দিনের শেষে হয়তো আমাদের প্রত্যেকের কাছেই একটি প্রশ্ন থেকে যায়—আমরা কত মানুষের খোঁজ নিয়েছি, তার হিসাবের পাশাপাশি কখনো কি ভেবেছি, কত মানুষ নীরবে আমাদের কাছ থেকে একটু আন্তরিকতা পাওয়ার অপেক্ষায় ছিল?
হয়তো পৃথিবীটা একদিনে বদলে যাবে না। কিন্তু আমরা যদি অন্তত একজন মানুষের না-বলা কথাগুলো শোনার চেষ্টা করি, একজন মানুষের অনুভূতিকে অবহেলা না করি, তাহলে সেই ছোট্ট চেষ্টাটুকুও কারও পৃথিবীকে একটু সুন্দর করে তুলতে পারে।
আর কে জানে, আমাদের একটি আন্তরিক প্রশ্ন—“তুমি কেমন আছ, সত্যি করে বলো”—হয়তো কোনো মানুষের দীর্ঘদিনের নীরবতার মধ্যে একটুখানি আশ্রয় হয়ে উঠবে।