
মানব সময় ডেস্ক :
শিক্ষা প্রশাসনের একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অঙ্গনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশের লক্ষ্যে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ৩৬টি বিষয়ে ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক ও সহ-পাঠ্যক্রমিক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি দৈনিক বাংলা ও ইংরেজি পত্রিকা পাঠের নির্দেশনা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী ও দূরদর্শী উদ্যোগ। এটি শুধু অতিরিক্ত কিছু কার্যক্রম চালুর সিদ্ধান্ত নয়; বরং প্রচলিত পরীক্ষাকেন্দ্রিক ও মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থাকে জীবনঘনিষ্ঠ, সৃজনশীল, মানবিক ও বাস্তবমুখী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
আধুনিক বিশ্বে শিক্ষার অর্থ কেবল পরীক্ষার খাতায় ভালো নম্বর অর্জন নয়। শিক্ষা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, যুক্তি দিয়ে ভাবতে শেখায়, সৃজনশীল হতে শেখায়, অন্যের সঙ্গে সহযোগিতা করতে শেখায় এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করে। তাই একজন শিক্ষার্থীর সাফল্য শুধু তার পরীক্ষার ফলাফলে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। তার চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা, নেতৃত্ব, সামাজিক দায়িত্ববোধ, নৈতিকতা, সাংস্কৃতিক চেতনা ও শারীরিক-মানসিক সক্ষমতাও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ইউনেস্কোর শিক্ষার চারটি মৌলিক স্তম্ভ—Learning to Know, Learning to Do, Learning to Live Together এবং Learning to Be—এই সামগ্রিক শিক্ষাদর্শেরই প্রতিফলন। অর্থাৎ শিক্ষার্থীকে শুধু জ্ঞান অর্জন করলেই হবে না; তাকে সেই জ্ঞান কাজে প্রয়োগ করতে হবে, অন্যের সঙ্গে মিলেমিশে চলতে হবে এবং একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে নিজের ব্যক্তিত্ব ও সম্ভাবনাকে বিকশিত করতে হবে।
ঘোষিত ৩৬টি কার্যক্রমের মধ্যে ১৫টি ক্রীড়া, ১৩টি সহ-পাঠ্যক্রমিক এবং ৮টি সাংস্কৃতিক কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ফুটবল, দাবা, বিজ্ঞান ক্লাব, বিতর্ক, বই পড়া, দেয়ালিকা প্রকাশ, আবৃত্তি, নাটক, সংগীত, পরিবেশ সংরক্ষণ, ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাণ ও মানসিক স্বাস্থ্যচর্চার মতো বৈচিত্র্যময় কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রতিভা ও আগ্রহ বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করবে।
প্রতিটি শিশুর মেধা ও সম্ভাবনা এক রকম নয়। কেউ খেলাধুলায় পারদর্শী, কেউ সংগীতে, কেউ সাহিত্যে, কেউ বিজ্ঞানচর্চায়, কেউ যুক্তিতর্কে, আবার কেউ নেতৃত্ব ও সংগঠনে অসাধারণ দক্ষতা দেখাতে পারে। হাওয়ার্ড গার্ডনারের বহুমাত্রিক বুদ্ধিমত্তার ধারণাও আমাদের সেই সত্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ফলে শুধু একটি পরীক্ষার নম্বর বা ফলাফলের মাধ্যমে একটি শিশুর সামগ্রিক যোগ্যতা নির্ধারণ করা কখনোই যথেষ্ট নয়।
এই বাস্তবতায় ৩৬টি সহ-পাঠ্যক্রমিক কার্যক্রম শিক্ষাব্যবস্থায় একটি নতুন ভারসাম্য তৈরি করতে পারে। শ্রেণিকক্ষের পাঠের পাশাপাশি খেলার মাঠ, বিজ্ঞান ক্লাব, বিতর্কসভা, সাংস্কৃতিক মঞ্চ, পাঠাগার ও পরিবেশচর্চার সুযোগ শিক্ষার্থীর বহুমাত্রিক বিকাশে সহায়ক হবে। এতে শিক্ষার্থীরা শুধু বইয়ের জ্ঞান অর্জন করবে না; বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শিখবে, নেতৃত্ব দিতে শিখবে, দলবদ্ধভাবে কাজ করতে শিখবে এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অর্জন করবে।
দৈনিক বাংলা ও ইংরেজি পত্রিকা পাঠের উদ্যোগটিও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদপত্র শিক্ষার্থীর সামনে শ্রেণিকক্ষের বাইরের বিশাল পৃথিবীকে উন্মুক্ত করে। নিয়মিত পত্রিকা পাঠের মাধ্যমে ভাষাজ্ঞান ও শব্দভান্ডার সমৃদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি দেশ, সমাজ, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও আন্তর্জাতিক বিশ্ব সম্পর্কে শিক্ষার্থীর ধারণা বিস্তৃত হয়। একই সঙ্গে তথ্য যাচাই, সংবাদ বিশ্লেষণ এবং সত্য ও মতামতের পার্থক্য বোঝার অভ্যাসও গড়ে উঠতে পারে।
মার্কিন শিক্ষাচিন্তক জন ডিউই বলেছিলেন, “Education is not preparation for life; education is life itself.” অর্থাৎ শিক্ষা কেবল ভবিষ্যৎ জীবনের প্রস্তুতি নয়; শিক্ষা নিজেই জীবনযাপনের একটি চলমান অভিজ্ঞতা। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বিদ্যালয়ের খেলাধুলা, বিতর্ক, সাংস্কৃতিক চর্চা, বিজ্ঞান অনুসন্ধান, বই পড়া কিংবা পরিবেশ রক্ষার কার্যক্রমকে মূল শিক্ষার বাইরে কোনো অতিরিক্ত আয়োজন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো শিক্ষারই অবিচ্ছেদ্য অংশ।
৩৬টি কার্যক্রম বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও নতুন রূপ পেতে পারে। বিদ্যালয় শুধু শ্রেণিকক্ষ, পরীক্ষা ও ফল প্রকাশের স্থান না হয়ে একটি প্রাণবন্ত সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। খেলার মাঠ হবে শারীরিক সক্ষমতা ও দলগত চেতনা বিকাশের ক্ষেত্র, বিজ্ঞান ক্লাব হবে অনুসন্ধিৎসার কেন্দ্র, বিতর্কচর্চা গড়ে তুলবে যুক্তিবোধ, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বিকশিত করবে নান্দনিকতা এবং বই পড়া তৈরি করবে জ্ঞান ও মননের ভিত্তি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সহ-পাঠ্যক্রমিক কার্যক্রমকে যেন আবারও কেবল প্রতিযোগিতা, পুরস্কার ও সনদনির্ভর করে তোলা না হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত অংশগ্রহণ, আনন্দ, দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস, নেতৃত্ব, সৃজনশীলতা ও মানবিক গুণাবলির বিকাশ। যে শিক্ষার্থী প্রথম হতে পারল না, তার অংশগ্রহণও যেন মূল্যহীন না হয়। কারণ শিক্ষার প্রকৃত সাফল্য সব সময় ট্রফি বা সনদে প্রকাশ পায় না; অনেক সময় তা প্রকাশ পায় একজন শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাসী আচরণে, সুন্দর চিন্তায়, দায়িত্বশীল কাজে এবং অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে।
এ জন্য অভিভাবকদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন প্রয়োজন। সন্তান কত নম্বর পেল—এই প্রশ্নের পাশাপাশি জানতে হবে, সে কী শিখল, কীভাবে চিন্তা করছে, কী পড়ছে, বন্ধুদের সঙ্গে কীভাবে কাজ করছে এবং সমাজ ও পরিবেশের প্রতি তার দায়িত্ববোধ কতটা তৈরি হচ্ছে। বিদ্যালয়, শিক্ষক ও অভিভাবকের সমন্বিত উদ্যোগেই সহ-পাঠ্যক্রমিক কার্যক্রম প্রকৃত অর্থে শিক্ষার্থীর জীবন গঠনের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
একটি জাতির ভবিষ্যৎ শুধু তার পাঠ্যবইয়ে লেখা থাকে না; তার ভবিষ্যৎ তৈরি হয় শ্রেণিকক্ষে, খেলার মাঠে, পাঠাগারে, সাংস্কৃতিক মঞ্চে, বিজ্ঞান ক্লাবে এবং শিক্ষার্থীর প্রতিদিনের চিন্তা ও আচরণের মধ্যে। তাই ৩৬টি সহ-পাঠ্যক্রমিক কার্যক্রমকে কেবল একটি প্রশাসনিক নির্দেশনা হিসেবে দেখলে এর সম্ভাবনা অপূর্ণ থেকে যাবে। এটিকে শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত ও মানসিক পরিবর্তনের একটি সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
আমাদের প্রয়োজন এমন এক প্রজন্ম, যারা শুধু পরীক্ষার্থী নয়—চিন্তাশীল; শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়—দক্ষ; শুধু তথ্যনির্ভর নয়—বিজ্ঞানমনস্ক; শুধু নিজের সাফল্য নিয়ে ব্যস্ত নয়—মানবিক ও দায়িত্বশীল; শুধু নিজের কথা বলে না—অন্যের কথাও শুনতে জানে।
৩৬টি সহ-পাঠ্যক্রমিক কার্যক্রম সেই মানুষ গড়ার শিক্ষার পথকে আরও বিস্তৃত করতে পারে। এখন প্রয়োজন নির্দেশনাকে কাগজে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাস্তবতায় সৃজনশীলভাবে প্রয়োগ করা। কারণ শিক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্য শুধু ভালো ফলাফল অর্জন নয়; জ্ঞানী, দক্ষ, সৃজনশীল, নৈতিক, মানবিক ও দায়িত্বশীল মানুষ তৈরি করা।