
মানব সময় ডেস্ক :
৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ব সাক্ষরতা দিবস। দিনটি শুধু অক্ষরজ্ঞান অর্জনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় না; ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের জ্ঞানভিত্তিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের অঙ্গীকারও সামনে আনে। বর্তমান বিশ্বে সাক্ষরতা মানে শুধু পড়তে, লিখতে ও গণনা করতে পারা নয়; তথ্য বুঝতে ও যাচাই করতে পারা, যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত নেওয়া, প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং নিজের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়াও এর অংশ।
২০২৬ সালের বিশ্ব সাক্ষরতা দিবসের প্রতিপাদ্য—“Literacy for People, the Planet and Prosperity”—বাংলায় “মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা”। UNESCO-এর এ প্রতিপাদ্য সাক্ষরতাকে মানুষ, পরিবেশ ও টেকসই সমৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করেছে। এবারের দিবসটি আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের ৬০ বছর পূর্তির কারণেও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
বাংলাদেশ সাক্ষরতা বিস্তারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ৭ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ। সরকার ২০৩১ সালের মধ্যে এ হার ৮৬ থেকে ৯০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে শুধু সাক্ষরতার হার বাড়ানো যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কার্যকর ও গুণগত সাক্ষরতা নিশ্চিত করা।
আজকের বড় চ্যালেঞ্জ হলো শেখার মান। বিদ্যালয়ে ভর্তি ও উপস্থিতির পাশাপাশি শিক্ষার্থীর পড়া, লেখা, গণনা, চিন্তা, বিশ্লেষণ ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ঝরে পড়া শিশু-কিশোর, বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা তরুণ এবং প্রাপ্তবয়স্ক নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার মূলধারায় আনতে হবে। সরকারের সাম্প্রতিক পরিকল্পনায় ২৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ৪৫ লাখ নিরক্ষর নারী-পুরুষকে প্রায়োগিক সাক্ষরতার আওতায় আনার উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে।
ডিজিটাল যুগে সাক্ষরতার সঙ্গে মিডিয়া ও তথ্য সাক্ষরতাও অপরিহার্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্যের পাশাপাশি গুজব ও বিভ্রান্তিকর বিষয় ছড়িয়ে পড়ছে। তাই কোন তথ্য সত্য, নির্ভরযোগ্য ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট—তা বিচার করার সক্ষমতা নাগরিকদের মধ্যে গড়ে তুলতে হবে।
সাক্ষরতা অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতিরও ভিত্তি। পড়া, লেখা, গণনা, তথ্য ব্যবহার ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সক্ষমতা কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা বাড়ায় এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের সুযোগ সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও পরিবেশ সংরক্ষণ সম্পর্কে সচেতনতা টেকসই উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।
এ ক্ষেত্রে পরিবার, বিদ্যালয় ও গণমাধ্যমের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারে পাঠাভ্যাস, বিদ্যালয়ে চিন্তা ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা এবং গণমাধ্যমে সত্যনিষ্ঠ ও যাচাই করা তথ্য পরিবেশন—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন। বিদ্যালয়কে শুধু পরীক্ষার ফলাফলকেন্দ্রিক না করে জ্ঞান, যুক্তি, মূল্যবোধ ও মানবিকতার চর্চাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, মর্যাদা ও পেশাগত উন্নয়নও নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশের জন্য সাক্ষরতা তাই শুধু শিক্ষার বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, সামাজিক ন্যায়, নারীর ক্ষমতায়ন, নাগরিক সচেতনতা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন। সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদেও সর্বজনীন, অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার ব্যবস্থা এবং নিরক্ষরতা দূর করার বিষয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে।
একজন শিক্ষক হিসেবে আমি মনে করি, জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান ক্ষেত্র শ্রেণিকক্ষ। আর একজন সাংবাদিক হিসেবে বিশ্বাস করি, সত্যনিষ্ঠ তথ্য, যুক্তিবোধ, পাঠাভ্যাস ও মুক্তচিন্তা একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি। তাই বাংলাদেশের সাক্ষরতা আন্দোলনকে হতে হবে জ্ঞানভিত্তিক, দক্ষতামুখী, প্রযুক্তিসচেতন, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক।
আমাদের লক্ষ্য শুধু নিরক্ষরতার হার কমানো নয়; এমন মানুষ তৈরি করা, যারা জ্ঞানকে জীবনের উন্নয়নে কাজে লাগাবে, নিজের অধিকার ও দায়িত্ব বুঝবে এবং সমাজ ও দেশের প্রতি দায়িত্বশীল থাকবে।
নিরক্ষরমুক্ত বাংলাদেশ শুধু একটি পরিসংখ্যানগত অর্জন নয়—এটি হবে আলোকিত মানুষ, সচেতন নাগরিক, দক্ষ জনশক্তি ও মানবিক সমাজ নির্মাণের ভিত্তি।