শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:২২ অপরাহ্ন
সংবাদ শিরোনাম ::
সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার কারিগর শিক্ষক: মর্যাদাই ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি —এম নজরুল ইসলাম খান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের ৩১ সদস্য বিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটির অনুমোদন আজিজ নগর সাংগঠনিক উপজেলা শাখা আইন হবে সাইবার সুরক্ষার ঢাল: অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ —এম নজরুল ইসলাম খান সিডিএ চেয়ারম্যানকে আনোয়ারা ফাউন্ডেশনের স্মারকলিপি বাংলাদেশ সাংবাদিক ক্লাব-বিজেসি’র ৮ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন চট্টগ্রামে ইয়েস একাডেমির প্রশিক্ষণ এবং গ্রীন শিফা হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক এর সাথে চিকিৎসা সেবামূলক কর্পোরেট চুক্তি সম্পন্ন। চট্টগ্রাম মডেল স্কুলে পিটিএ ও স্টুডেন্ট কাউন্সিলের যৌথ সভা অনুষ্ঠিত: ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে বিশেষ গুরুত্ব আজকের মানব সময় সাহিত্য প্রকাশিত হলো শিক্ষানবিশ আইনজীবী শারমিন সুলতানা ঝুমুর লেখা “ব্যক্তিত্ব” আমাকে রাজকীয় সম্মান দিয়েছিল ফেনী – নীলিমা আক্তার নীলা আমাকে রাজকীয় সম্মান দিয়েছিল ফেনী – নীলিমা আক্তার নীলা

জ্ঞান, বিজ্ঞান ও নৈতিকতার সমন্বয়ে আগামীর বাংলাদেশ: সমন্বিত শিক্ষাদর্শনের প্রয়োজনীয়তা –এম নজরুল ইসলাম খান

  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬, ১২.৪৮ পিএম
  • ১১১ বার পঠিত

মানব সময় ডেস্ক :
একবিংশ শতাব্দীর বিশ্ব জ্ঞান, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও মানবিক মূল্যবোধের এক নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জিনপ্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে একটি জাতির অগ্রগতি আর শুধু অর্থনৈতিক সূচকের মাধ্যমে পরিমাপ করা যায় না; বরং নির্ধারিত হয় সেই জাতির জ্ঞানচর্চা, গবেষণা সক্ষমতা, নৈতিক নেতৃত্ব এবং মানবিক মূল্যবোধের মানদণ্ডে। বাংলাদেশও একটি জ্ঞানভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর উন্নত রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছে। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনও বিভিন্ন ধারায় বিভক্ত—সাধারণ শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, আলিয়া ও কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা। এই বৈচিত্র্য যথাযথ সমন্বয়ের মাধ্যমে জাতীয় শক্তিতে রূপান্তরিত হওয়ার সুযোগ রাখলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে তা জ্ঞান ও মূল্যবোধের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় দূরত্ব সৃষ্টি করেছে। বর্তমান সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কীভাবে এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, যেখানে আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, মানবিক শিক্ষা, ধর্মীয় জ্ঞান ও নৈতিকতা একই ধারায় বিকশিত হবে। এ প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানে ইসলামী জ্ঞানতত্ত্ব এবং মুসলিম সভ্যতার ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিতে পারে। ইসলামী জ্ঞানতত্ত্বের মৌলিক ভিত্তি হলো জ্ঞানের অখণ্ডতা। পবিত্র কুরআনের প্রথম নির্দেশ ‘ইকরা’ বা ‘পড়ো’ মানবজাতিকে জ্ঞান অনুসন্ধানের এক সর্বজনীন আহ্বান জানায়। এখানে জ্ঞানকে কেবল ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি; বরং প্রকৃতি, সমাজ, ইতিহাস এবং মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে চিন্তা, পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ইসলামী ঐতিহ্যে ওয়াহি এবং পর্যবেক্ষণ, অভিজ্ঞতা ও গবেষণালব্ধ জ্ঞানকে পরস্পরবিরোধী নয়, বরং পরিপূরক হিসেবে দেখা হয়। সত্য অনুসন্ধান এবং মানবকল্যাণ প্রতিষ্ঠাই উভয়ের অভিন্ন লক্ষ্য। মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগ এই সমন্বিত জ্ঞানচর্চার উজ্জ্বল সাক্ষ্য বহন করে। সে সময় ধর্মতত্ত্ব, দর্শন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, ভাষাবিজ্ঞান এবং সমাজবিজ্ঞানকে পৃথক জগত হিসেবে দেখা হতো না; বরং একই জ্ঞানধারার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। মরক্কোর কারাউইয়্যিন বিশ্ববিদ্যালয় এবং মিশরের আল-আজহার শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এমন সমন্বিত জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে বিশ্বসভ্যতাকে সমৃদ্ধ করেছে। এই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় ইবনে সিনা, আল-বিরুনী, আল-খাওয়ারিজমী ও ইবনে খালদুনের মতো মনীষীরা বিশ্বজ্ঞানকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। একইভাবে মাহাদভিত্তিক উচ্চতর ইসলামী শিক্ষাপদ্ধতিতেও ভাষা, ব্যাকরণ, যুক্তিশাস্ত্র, ব্যাখ্যাবিদ্যা এবং সমালোচনামূলক বিশ্লেষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। আরবি ভাষার কাঠামোগত বিশ্লেষণ এবং মানতিক বা যুক্তিশাস্ত্রের চর্চা শিক্ষার্থীদের যুক্তি নির্মাণ, সমালোচনামূলক মূল্যায়ন ও গবেষণামুখী চিন্তায় দক্ষ করে তোলে। আধুনিক Inquiry-Based Learning, Critical Thinking এবং Research-Oriented Education-এর সঙ্গে এই পদ্ধতির উল্লেখযোগ্য সাদৃশ্য রয়েছে। তবে বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তিনির্ভর বাস্তবতায় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী শিক্ষার আরও বিস্তৃত সংযোজন অপরিহার্য। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে যে কেবল ধর্মীয় শিক্ষা কিংবা কেবল প্রযুক্তিগত শিক্ষা—কোনোটিই এককভাবে ভবিষ্যতের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম নয়। প্রযুক্তিগত দক্ষতা থাকলেও নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের ঘাটতি সমাজে নানা সংকট সৃষ্টি করতে পারে, আবার ধর্মীয় জ্ঞান থাকলেও আধুনিক বিজ্ঞান ও গবেষণা থেকে বিচ্ছিন্নতা জাতীয় উন্নয়নের গতিকে সীমাবদ্ধ করে দিতে পারে। তাই সময়ের দাবি হলো এমন একটি সমন্বিত শিক্ষাদর্শন, যেখানে জ্ঞান, বিজ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ একসঙ্গে বিকশিত হবে। এ লক্ষ্যে মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে অনুসন্ধানভিত্তিক ও গবেষণামুখী শিক্ষার প্রসার, আন্তঃবিভাগীয় শিক্ষার বিকাশ, চরিত্র গঠন ও নাগরিক দায়িত্ববোধের শিক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও সহনশীলতার চর্চা এবং গবেষণা ও উদ্ভাবনকে শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এমন একটি প্রজন্মের ওপর, যারা একই সঙ্গে দক্ষ গবেষক, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, শিক্ষক, আলেম, চিন্তাবিদ এবং নৈতিক নেতৃত্বের অধিকারী হবে। একটি উন্নত রাষ্ট্র গঠনের জন্য যেমন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অপরিহার্য, তেমনি ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য নৈতিকতা ও মূল্যবোধও সমান গুরুত্বপূর্ণ। জ্ঞানহীন নৈতিকতা যেমন অকার্যকর, তেমনি নৈতিকতাহীন জ্ঞানও মানবকল্যাণ নিশ্চিত করতে পারে না। তাই বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের লক্ষ্য হওয়া উচিত বিভাজন নয়, সমন্বয়; প্রতিযোগিতা নয়, সহযোগিতা; এবং মুখস্থনির্ভরতা নয়, অনুসন্ধান, গবেষণা ও সৃজনশীলতার বিকাশ। নিজস্ব ঐতিহ্য, ইসলামী জ্ঞানতত্ত্ব, আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক শিক্ষানুভবকে সমন্বিত করে একটি নতুন শিক্ষাদর্শন নির্মাণের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠতে পারে এমন এক বাংলাদেশ, যা হবে জ্ঞানসমৃদ্ধ, মানবিক, নৈতিক ও সমৃদ্ধ; আর যার নাগরিকরা হবে কেবল কর্মসংস্থানের উপযোগী জনশক্তি নয়, বরং চিন্তাশীল, সৃজনশীল, দায়িত্বশীল এবং মানবকল্যাণে নিবেদিত মানুষ।
(লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষক)

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved  2021 manobsomoy
Theme Developed BY ThemesBazar.Com