
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রধান ভিত্তিগুলোর একটি হলো মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা। একটি মেধাবী, দক্ষ, মানবিক ও সুশাসিত প্রজন্ম গড়ে তোলার কাজ শুরু হয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ থেকেই। তাই প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত রূপান্তর শুধু সরকারের একক দায়িত্ব নয়; শিক্ষক, বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদ, শিক্ষা প্রশাসন, অভিভাবক ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্বও এর সঙ্গে জড়িত।
প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসনে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা, সমস্যা ও সম্ভাবনাকে সামনে রেখে যে প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। এসব উদ্যোগকে শুধু সভা, প্রশিক্ষণ বা নির্দেশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বিদ্যালয় ও শ্রেণিকক্ষে বাস্তব পরিবর্তনে রূপ দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সাতটি অঙ্গীকার কার্যকর রূপান্তরের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে।
প্রথম অঙ্গীকার—বিদ্যালয়কে কার্যকর ও সুশৃঙ্খল করা। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান, সময়ানুবর্তিতা, পরিচ্ছন্নতা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যালয় পরিচালকদের বিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। শিক্ষা কর্মকর্তাদেরও শুধু দাপ্তরিক প্রতিবেদন নয়, বাস্তব বিদ্যালয় পরিদর্শনের মাধ্যমে পরিস্থিতি যাচাই করতে হবে।
দ্বিতীয় অঙ্গীকার—শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের কার্যকর উপস্থিতি নিশ্চিত করা। শুধু হাজিরা খাতা বা বায়োমেট্রিক উপস্থিতি শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে পারে না। শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে কীভাবে পাঠদান করছেন, শিক্ষার্থীরা কতটা অংশ নিচ্ছে এবং পাঠ কতটা বোধগম্য হচ্ছে—এসব বিষয়ও তদারকির আওতায় আনতে হবে। শিক্ষককে নিয়মিত প্রস্তুতি, আধুনিক পদ্ধতি ও শিশুবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয় অঙ্গীকার—ঝরে পড়া রোধ ও প্রকৃত শিক্ষার্থী নিশ্চিত করা। বিদ্যালয়ে ভর্তি থাকা শিক্ষার্থীর প্রকৃত সংখ্যা, উপস্থিতি ও বিদ্যালয়ে টিকে থাকার বিষয়টি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। অনুপস্থিত বা ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা শিশুর কারণ চিহ্নিত করে শিক্ষক, অভিভাবক ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে যৌথভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে।
চতুর্থ অঙ্গীকার—মূল্যায়নে শিখনকে প্রাধান্য দেওয়া। শুধু পরীক্ষার নম্বর দিয়ে শিশুর প্রকৃত জ্ঞান ও দক্ষতা নির্ধারণ করা যাবে না। সে কী শিখেছে, কতটা বুঝেছে এবং বাস্তব জীবনে তা প্রয়োগ করতে পারছে কি না—এসব বিষয় মূল্যায়নের অংশ হতে হবে। শিক্ষকদের ধারাবাহিক মূল্যায়ন ও শিখন-অগ্রগতির তথ্য সংরক্ষণে আরও দক্ষ হতে হবে।
পঞ্চম অঙ্গীকার—সরকারি শিক্ষা-সহায়তার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা। উপবৃত্তি, টিফিনসহ বিভিন্ন শিক্ষা-সহায়তা প্রকৃত ও যোগ্য শিক্ষার্থীর কাছে স্বচ্ছতার সঙ্গে পৌঁছাতে হবে। এ ক্ষেত্রে সঠিক তথ্য সংরক্ষণ, যাচাই ও তদারকিতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষা প্রশাসনের বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। কোনো অনিয়ম বা বৈষম্য যেন শিক্ষার্থীর অধিকার ক্ষুণ্ন না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
ষষ্ঠ অঙ্গীকার—নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর বিদ্যালয় নিশ্চিত করা। ভবন, শ্রেণিকক্ষ, সিঁড়ি, খেলার মাঠ, শৌচাগার, বিশুদ্ধ পানি ও বিদ্যুৎব্যবস্থাসহ বিদ্যালয়ের প্রতিটি অবকাঠামো নিরাপদ ও ব্যবহারযোগ্য রাখতে হবে। শিক্ষার্থীর শারীরিক নিরাপত্তার পাশাপাশি মানসিক নিরাপত্তাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। ভয়, অপমান বা শাস্তির পরিবর্তে আনন্দময় ও শিশুবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।
সপ্তম অঙ্গীকার—মানবিক ও সেবামুখী শিক্ষা প্রশাসন গড়ে তোলা। শিশু, অভিভাবক, শিক্ষক, পরিচালনা পর্ষদ, গণমাধ্যমকর্মী ও সাধারণ নাগরিকের সঙ্গে শিক্ষা প্রশাসনের আচরণ হতে হবে সম্মানজনক, সহমর্মী ও সহযোগিতাপূর্ণ। একজন কর্মকর্তা বা বিদ্যালয়প্রধানের দায়িত্ব শুধু নির্দেশ দেওয়া নয়; সমস্যা শুনে সমাধানে সহায়তা করাও তাঁর কর্তব্য।
এই সাতটি অঙ্গীকার বাস্তবায়নে শিক্ষকদের পাশাপাশি বিদ্যালয় পরিচালকদের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য। আর শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব হবে নিয়মিত পরিদর্শন, বাস্তবভিত্তিক তদারকি, সমস্যা চিহ্নিতকরণ, পরামর্শ প্রদান এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে ভালো কাজের স্বীকৃতি ও উৎসাহও দিতে হবে।
প্রাথমিক শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন কেবল নতুন নির্দেশনা জারি করে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন, তদারকি, মূল্যায়ন ও জবাবদিহিতার ধারাবাহিক ব্যবস্থা। তাই শিক্ষক, বিদ্যালয় পরিচালক, শিক্ষা কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এই সাত অঙ্গীকার বাস্তবায়নে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
সব সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে শিশু। তার নিরাপত্তা, আনন্দ, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা, শিখন-অর্জন ও ভবিষ্যৎ দক্ষতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এগোতে পারলেই প্রাথমিক শিক্ষার এই নতুন অভিযাত্রা সফল হবে। সাত অঙ্গীকার তখন শুধু একটি কর্মপরিকল্পনা নয়, হয়ে উঠবে একটি মানসম্মত, শিশুবান্ধব, জবাবদিহিমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী প্রাথমিক শিক্ষা গড়ার জাতীয় প্রত্যয়।