
প্রান্তিক জনপদের বিশেষ প্রতিবেদন :
রাষ্ট্রক্ষমতায় সরকার বারবার পরিবর্তন হলেও ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলার চরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। নদীভাঙন, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, চিকিৎসাবঞ্চনা এবং শিক্ষা খাতের চরম বিপর্যয়ের মধ্যে বছরের পর বছর ধরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তজুমদ্দিনের চর জহির উদ্দিন, চর মোজাম্মেল, চর লাদেন,নাগর পাটোয়ারী চর সহ অনন্য চরের হাজার হাজার মানুষ। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় তাদের সুরক্ষার জন্য নেই পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র, আর দৈনন্দিন জীবনে সিন্ডিকেট ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের নানা অনিয়ম তাদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে।
তজুমদ্দিন উপজেলার বিভিন্ন চরের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম নৌপথ। কিন্তু পারাপারের জন্য নেই কোনো আধুনিক বা নিরাপদ ব্যবস্থা। সামান্য কালবৈশাখী ঝড় বা তীব্র বাতাস শুরু হলেই উত্তাল মেঘনা নদীতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌকা পারাপার হতে হয় শিশু,বৃদ্ধ,রোগী ও সাধারণ মানুষকে। প্রতিদিনের এই যাতায়াত যেন এক অনিশ্চিত যুদ্ধ। নদী পারাপারের সময় বহু মানুষ দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির হলে ও টনক নড়েনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
রাতে অসুস্থ হলে চরম বিপত্তি
চরাঞ্চলগুলোর স্বাস্থ্যসেবার চিত্র অত্যন্ত করুণ।বেশিরভাগ চরেই নেই কোনো কমিউনিটি ক্লিনিক বা সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র। দিনের বেলা কোনো রকমে হাতুড়ে চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হতে পারলেও রাতের বেলা কোনো গর্ভবতী নারী বা সাপে কাটা রোগী কিংবা গুরুতর অসুস্থ কেউ বিপদে পড়লে তাদের বাঁচার কোনো উপায় থাকে না। যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ থাকায় এবং রাতে নদী পারাপারের নৌকা না পাওয়ায় সঠিক চিকিৎসার অভাবে অনেককে চরেই ধুঁকে ধুঁকে প্রাণ হারাতে হয়।
শিক্ষা ব্যবস্থার চরম বেহাল দশার কারণে চরের হাজার হাজার শিশু আলোর মুখ দেখছে না। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম। অনেক চরে স্কুল থাকলেও নদীভাঙনে তা বিলীন হয়ে গেছে, কিংবা শিক্ষকরা নিয়মিত চরে গিয়ে ক্লাস নেন না। ফলে দিনমজুর, জেলে বা কৃষকের সন্তানেরা প্রাথমিক শিক্ষা শেষ না করেই শ্রমে জড়িয়ে পড়ছে। শিক্ষার অভাবে পিছিয়ে পড়ছে পুরো একটি প্রজন্ম।
ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় চরাঞ্চলের মানুষের সুরক্ষার জন্য নেই পর্যাপ্ত সাইক্লোন শেল্টার বা আশ্রয়কেন্দ্র। প্রতিবছর বর্ষা ও দুর্যোগের সময় নদীভাঙন এবং জলোচ্ছ্বাসের কবলে পড়ে সর্বহারা হন চরের বাসিন্দারা। গবাদিপশু ও পরিবার নিয়ে কোথায় আশ্রয় নেবেন—দুর্যোগের সময় এই দুশ্চিন্তায় দিন কাটে তাদের।
চরের কৃষকদের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে অতিরিক্ত উৎপাদন খরচ এবং স্থানীয় কিছু প্রভাবশালীর কারণে। সার, বীজ ও ডিজেলের চড়া দামের পাশাপাশি চরে ট্রাক্টর বা পাওয়ার টিলার দিয়ে জমি চাষ করাতে কৃষকদের অতিরিক্ত ও চড়া মূল্য পরিশোধ করতে হয়।
এর ওপর চরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য নতুন আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে তথাকথিত ‘ব্লক লিডার’ নামের একটি প্রভাবশালী চক্র। অভিযোগ রয়েছে, এসব ব্লক লিডার কৃষকদের জমি দখল, চাষাবাদে বাধা প্রদান এবং নানা অজুহাতে চাঁদা আদায় করে থাকে। প্রতিবাদ করলে চরের সহজ সরল মানুষের ওপর নেমে আসে নির্যাতনের ঢল।
ভোটের সময় প্রার্থীরা চরে এসে নানা উন্নয়নের রঙিন স্বপ্ন দেখান। কিন্তু নির্বাচন শেষ হলে আমাদের খোঁজ কেউ রাখে না।
স্বাধীনতার দীর্ঘ ৫৫ বৎসর পেরিয়ে গেলেও চরবাসীর মৌলিক অধিকার – শিক্ষা, চিকিৎসা,নিরাপত্তা ও যোগাযোগ আজ ও নিশ্চিত হয়নি।সরকার আসে, সরকার যায়, তাদের ভাগ্য বদলায় না।”
চরাঞ্চলের এসব অসহায় মানুষের জীবনমান উন্নয়নে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া, আধুনিক ও নিরাপদ খেয়া পারাপারের ব্যবস্থা করা, পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ এবং চাঁদাবাজ ও ব্লক লিডারদের সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল ও স্থানীয়রা।