মানব সময় সাহিত্য ডেস্ক :
একটা সময় ছিলো, কোনো গ্রামের একজন মানুষকে “মাস্টার সাহেব” বলে ডাকা হতো শুধু তিনি স্কুলে পড়ান বলে নয়। মানুষ তাঁকে সম্মান করতো তাঁর ব্যবহারের জন্য। গ্রামের ঝগড়া মেটাতে তাঁকে ডাকা হতো, কারো ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরামর্শ নিতে তাঁর কাছে যাওয়া হতো। কারণ মানুষ বিশ্বাস করতো, শিক্ষা একজন মানুষকে কেবল জ্ঞানী করে না, বিচক্ষণও করে।
আজ দৃশ্যটা অনেকটাই বদলে গেছে।
আমাদের দেশে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে নতুন নতুন সনদ হাতে নিচ্ছে। এটা অবশ্যই আনন্দের খবর। যে জাতি শিক্ষায় এগোয়, সে জাতি পিছিয়ে থাকে না। কিন্তু এই আনন্দের মাঝেও একটা প্রশ্ন প্রায়ই মাথায় আসে। আমরা কি শুধু সনদধারী মানুষ তৈরি করছি, নাকি সত্যিকার অর্থে মানুষও গড়ে তুলতে পারছি?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুব বেশি দূরে যেতে হয় না।
বাসে উঠে একটু চারপাশে তাকালেই দেখা যায়, একজন বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছেন, অথচ কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছেলে-মেয়ে মাথা নিচু করে মোবাইল দেখছে। রাস্তায় দুর্ঘটনা ঘটলে অনেকেই আগে মোবাইল বের করে ভিডিও করেন, সাহায্যের হাত বাড়ান পরে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতের অমিল হলেই আমরা যুক্তির বদলে ব্যক্তিগত আক্রমণে নেমে যাই। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। বরং এগুলো আমাদের সময়েরই প্রতিচ্ছবি।
প্রশ্ন হলো, এত পড়াশোনা করেও আমরা এই ছোটো ছোটো মানবিক বিষয়গুলো কোথায় হারিয়ে ফেলছি?
সম্ভবত আমরা শিক্ষার উদ্দেশ্যটাই একটু বদলে ফেলেছি।
আজ একজন শিক্ষার্থীকে ছোটোবেলা থেকেই শেখানো হয়, ভালো ফল করতে হবে। ভালো কলেজে ভর্তি হতে হবে। ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হবে। তারপর একটা ভালো চাকরি। এই চাওয়াগুলোর কোনো দোষ নেই। বরং প্রত্যেক পরিবারেরই এমন স্বপ্ন থাকে। কিন্তু পুরো শিক্ষাজীবন যদি কেবল প্রতিযোগিতার মধ্যে আটকে যায়, তাহলে মানুষ হওয়ার পাঠটা কখন শেখা হবে?
একজন মানুষ অনেক কিছু জানতেই পারেন। তিনি বিজ্ঞানে দক্ষ হতে পারেন, প্রযুক্তিতে পারদর্শী হতে পারেন, বড়ো প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে পারেন। কিন্তু যদি তিনি অন্যের কষ্ট বুঝতে না শেখেন, নিজের ভুল স্বীকার করতে না পারেন, কিংবা সুবিধা পেলেই নিয়ম ভাঙাকে বুদ্ধিমত্তা মনে করেন, তাহলে তাঁর শিক্ষা কোথাও না কোথাও অপূর্ণ থেকে যায়।
আমরা প্রায়ই বলি, শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড।
কিন্তু মেরুদণ্ড যদি শুধু দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিই দেয়, সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সাহস না দেয়, তাহলে সেই শক্তির মূল্য কতটুকু?
হয়তো এই কারণেই আজ আমাদের সমাজে শিক্ষিত মানুষের অভাব নেই, অথচ অনেক সময় মানবিক মানুষের অভাব অনুভূত হয়।
শিক্ষার সবচেয়ে বড়ো সৌন্দর্য হলো, এটি মানুষকে বিনয়ী করে। যত বেশি শেখা যায়, তত বেশি বোঝা যায় কতকিছু এখনো শেখা বাকি। কিন্তু আজ আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে অনেক সময় সনদ বাড়ছে, আত্মবিশ্বাস বাড়ছে, অথচ বিনয় বাড়ছে না। মতের অমিল হলেই আমরা মানুষকে ছোটো করে দেখি, সামাজিক অবস্থান দিয়ে বিচার করি, কিংবা নিজের সাফল্যকে অন্যের ব্যর্থতার সঙ্গে তুলনা করে আনন্দ পাই। এসবের কোনোটাই শিক্ষা আমাদের শেখায় না।
এর দায় শুধু শিক্ষার্থীদের নয়।
একটি শিশু যখন বড়ো হয়, সে শুধু বই থেকে শেখে না। সে শেখে পরিবারের আচরণ দেখে, শিক্ষকের ব্যবহার দেখে, সমাজের মানুষকে দেখে। বাবা যদি নিয়ম ভাঙাকে বুদ্ধিমত্তা বলে শেখান, শিক্ষক যদি কেবল পরীক্ষার নম্বর নিয়েই ব্যস্ত থাকেন, আর সমাজ যদি সততার চেয়ে সফলতাকেই বড়ো করে দেখে, তাহলে সেই শিশুর কাছে শিক্ষা মানে ধীরে ধীরে কেবল এগিয়ে যাওয়ার একটি সিঁড়ি হয়ে ওঠে। মানুষ হয়ে ওঠার পথটি তখন অচেনাই থেকে যায়।
আমরা হয়তো ভুলে যাচ্ছি, সভ্যতা তৈরি হয় না শুধু উঁচু দালান, আধুনিক শহর কিংবা নতুন প্রযুক্তি দিয়ে। সভ্যতা তৈরি হয় মানুষের আচরণে।
একজন অচেনা মানুষকে সম্মান করার মধ্যে সভ্যতা আছে। নিজের দায়িত্ব সততার সঙ্গে পালন করার মধ্যে সভ্যতা আছে। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অন্যায় না করার মধ্যে সভ্যতা আছে। এই শিক্ষাগুলোর কোনো আলাদা পাঠ্যবই নেই। তবু এগুলোই সবচেয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষা।
আজকের পৃথিবী আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দ্রুত বদলাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কয়েক সেকেন্ডে তথ্য এনে দিচ্ছে, নতুন দক্ষতা শেখাচ্ছে, অনেক কাজ সহজ করে দিচ্ছে। কিন্তু কোনো প্রযুক্তিই একজন মানুষকে বিবেকবান বানাতে পারে না।
সেই কাজ এখনো পরিবার, শিক্ষক, সমাজ এবং নিজের আত্মসমালোচনার।
হয়তো এ কারণেই একজন নিরক্ষর মানুষও অনেক সময় আমাদের বড়ো শিক্ষা দিয়ে যান। আবার উচ্চশিক্ষিত একজন মানুষও কখনো কখনো এমন কাজ করেন, যা দেখে প্রশ্ন জাগে, এত পড়াশোনা করে তিনি আসলে কী শিখলেন?
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হলে আমরা নতুন কারিকুলাম, পরীক্ষার ধরন, প্রযুক্তির ব্যবহার কিংবা আন্তর্জাতিক মান নিয়ে কথা বলি।
এসব অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই আলোচনার মাঝখানে একটি প্রশ্নও রাখা দরকার। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কি এমন মানুষ গড়ে তুলছে, যাঁদের ওপর সমাজ নিশ্চিন্তে ভরসা করতে পারে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পারলে হয়তো শিক্ষার অনেক সমস্যার উত্তরও পাওয়া যাবে।
কারণ একটি দেশের সবচেয়ে বড়ো সম্পদ তার প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, তার শিক্ষিত মানুষ।
আর সেই শিক্ষিত মানুষ যদি মানবিক, ন্যায়পরায়ণ ও দায়িত্বশীল হোন, তাহলে একটি সমাজকে এগিয়ে নিতে আলাদা কোনো অলৌকিক শক্তির প্রয়োজন হয় না।
ডিগ্রি প্রয়োজন, দক্ষতা প্রয়োজন, গবেষণা প্রয়োজন। কিন্তু তারও আগে প্রয়োজন মানুষ হওয়া। কারণ একজন ভালো প্রকৌশলী একটি সেতু নির্মাণ করতে পারেন, একজন ভালো চিকিৎসক একজন রোগীকে সুস্থ করতে পারেন, একজন ভালো বিচারক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারেন। কিন্তু তাঁরা যদি আগে ভালো মানুষ না হোন, তাহলে তাঁদের জ্ঞানই একদিন মানুষের জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
শিক্ষার সাফল্য তাই কেবল সমাবর্তনের কালো গাউনে নয়, একজন মানুষের চরিত্রে ফুটে ওঠে। একটি সনদ দেয় যোগ্যতার স্বীকৃতি, কিন্তু মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ, সততা, সহমর্মিতা আর নৈতিকতা দেয় প্রকৃত শিক্ষা।
হয়তো সময় এসেছে নিজেদের আবারও প্রশ্ন করার। আমরা কি শুধু ডিগ্রি অর্জনের জন্য পড়ছি, নাকি এমন একটি সমাজ গড়ার জন্যও শিখছি, যেখানে একজন মানুষ আরেকজন মানুষের কাছে নিরাপদ, সম্মানিত এবং বিশ্বাসের জায়গা হয়ে উঠতে পারে?
যেদিন এই প্রশ্নের উত্তর আমরা কাজে খুঁজতে শুরু করবো, সেদিন হয়তো আর বলতে হবে না, “যে শিক্ষা মানুষ গড়তে ভুলে যাচ্ছে।” বরং গর্ব করে বলতে পারবো, আমাদের শিক্ষা আবার মানুষ গড়ার কাজেই ফিরে এসেছে।
Editor : Md.Moslauddin (Bahar) Cell: 01919802081 Dhaka Office :: Manni Tower, Road 09,House : 1258 Mirpur Dhaka. Cell:01747430235 email : manobsomoynews@gmail.com Chattogram office :: Lusai Bhaban,( 2nd Floor) Cheragi Pahar Circle, Chattogram. Cell: 01919802081
© All rights reserved manobsomoy