বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রশ্ন সামনে এনেছে। মেয়েরা ধারাবাহিকভাবে ভালো করছে—এটি অবশ্যই আনন্দের ও প্রশংসার বিষয়। কিন্তু একই সঙ্গে ছেলেদের ফলাফল পিছিয়ে যাচ্ছে এবং ছেলে-মেয়ের ফলাফলের ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। বিষয়টি এখন আর উপেক্ষা করার মতো নয়; শিক্ষা প্রশাসন, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষাবিদ—সবারই এটি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
২০২৬ সালের SSC ও সমমান পরীক্ষায় মেয়েদের পাসের হার ৬৬.৬৮ শতাংশ, ছেলেদের ৫৭.৮৬ শতাংশ। অর্থাৎ মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে ৮.৮২ শতাংশ পয়েন্ট এগিয়ে। GPA-5 অর্জনেও মেয়েরা এগিয়ে—মেয়েদের ৬৩,৮৯৬ জনের বিপরীতে ছেলেদের ৫২,৭৮০ জন GPA-5 পেয়েছে। ২০২৫ সালে পাসের হারে ব্যবধান ছিল ৫.১৫ শতাংশ পয়েন্ট এবং ২০২৪ সালে ২.৯০ শতাংশ পয়েন্ট। অর্থাৎ ব্যবধানটি ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
একই সঙ্গে সামগ্রিক ফলাফলও উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালে SSC ও সমমান পরীক্ষায় মোট পাসের হার ৬২.২৫ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের ৬৮.৪৫ শতাংশের চেয়ে ৬.২০ শতাংশ পয়েন্ট কম। GPA-5-ও ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ থেকে কমে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ হয়েছে। ফলে শুধু ছেলেদের পিছিয়ে পড়া নয়, সামগ্রিক শিক্ষার মান নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে।
প্রশ্ন হলো—ছেলেরা কেন পিছিয়ে যাচ্ছে?
শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কিছু ছেলে শিক্ষার্থীর মধ্যে শ্রেণিকক্ষে অমনোযোগ, শিক্ষকের নির্দেশনা না শোনা, পড়াশোনার প্রতি অনীহা এবং এক ধরনের ‘থোড়াই কেয়ার’ মনোভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এটি অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। তবে কোনো একটি কারণকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়া যাবে না। পরিবার, সামাজিক পরিবেশ, মোবাইল ও প্রযুক্তির ব্যবহার, বিদ্যালয়ের পরিবেশ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক, ভবিষ্যৎ লক্ষ্য এবং শিক্ষার্থীর মানসিকতার পরিবর্তন—সবকিছুর প্রভাব থাকতে পারে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীদের চিন্তা ও আচরণে পরিবর্তন এসেছে—এমন পর্যবেক্ষণও অনেক শিক্ষকের রয়েছে। কিন্তু ছেলেদের ফল খারাপ হওয়ার কারণ হিসেবে সরাসরি রাজনৈতিক ঘটনাকে দায়ী করা সমীচীন হবে না। রাজনীতি নয়, তথ্য ও গবেষণার ভিত্তিতে প্রকৃত কারণ নির্ণয় করতে হবে।
এখানেই শিক্ষা প্রশাসনের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। শিক্ষা বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের উচিত ফলাফল প্রকাশের পাশাপাশি ছেলে-মেয়ের ফলাফলের ব্যবধান, বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতা, উপস্থিতি, ঝরে পড়া এবং শ্রেণিকক্ষের আচরণ নিয়ে তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ করা। কোন শ্রেণি থেকে ছেলেরা পিছিয়ে যাচ্ছে এবং কেন—তা চিহ্নিত করে বিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও সহায়তা পৌঁছে দিতে হবে।
বিদ্যালয়ে দুর্বল ও অমনোযোগী ছেলে শিক্ষার্থীদের শুধু শাস্তি না দিয়ে শিক্ষক-অভিভাবক-শিক্ষার্থী সমন্বিতভাবে তাদের সমস্যা চিহ্নিত করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী মেন্টরিং, কাউন্সেলিং ও অতিরিক্ত শিক্ষাসহায়তা দিতে হবে। শিক্ষককে হতে হবে একই সঙ্গে দৃঢ় ও সহানুভূতিশীল; শৃঙ্খলা থাকবে, তবে অপমান নয়।
অভিভাবকদেরও দায়িত্ব নিতে হবে। সন্তানকে শুধু পরীক্ষার ফলের জন্য চাপ না দিয়ে তার পড়াশোনার পরিবেশ, মোবাইল ব্যবহার, সময় ব্যবস্থাপনা, আচরণ ও ভবিষ্যৎ লক্ষ্য সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। ছেলে সন্তান বলে অনিয়ম বা দায়িত্বহীনতাকে স্বাভাবিক হিসেবে দেখার মানসিকতাও বদলাতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিষয়টি যেন কোনোভাবেই ছেলে বনাম মেয়ের প্রতিযোগিতায় পরিণত না হয়। মেয়েদের সাফল্য আমাদের অর্জন; কিন্তু ছেলেদের পিছিয়ে পড়াও আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। উভয় পক্ষের সম্ভাবনা বিকশিত করাই শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত।
২০২৬ সালের ফলাফল তাই শুধু একটি পরীক্ষার ফল নয়; এটি শিক্ষা ব্যবস্থার সামনে একটি প্রশ্ন। ছেলেরা কেন পিছিয়ে যাচ্ছে এবং ব্যবধান কেন বাড়ছে—এর নির্ভরযোগ্য উত্তর এখনই খুঁজে বের করতে হবে।
কারণ আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ। একটি ছেলে শিক্ষার্থীর সম্ভাবনা নষ্ট হওয়া শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়—এটি দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদের ক্ষতি। তাই দোষারোপ নয়, গবেষণা; অনুমান নয়, তথ্য; এবং শুধু ফল প্রকাশ নয়—ফলের কারণ নির্ণয় করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সময়ের দাবি।
(লেখক :সাংবাদিক ও শিক্ষক)
Editor : Md.Moslauddin (Bahar) Cell: 01919802081 Dhaka Office :: Manni Tower, Road 09,House : 1258 Mirpur Dhaka. Cell:01747430235 email : manobsomoynews@gmail.com Chattogram office :: Lusai Bhaban,( 2nd Floor) Cheragi Pahar Circle, Chattogram. Cell: 01919802081
© All rights reserved manobsomoy