মানব সময় ডেস্ক :
অবাধ তথ্য প্রবাহের যুগে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে দেশে বেঁচে থাকা প্রবীন বীর মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে সম্মানিত হচ্ছেন। তাঁদের অবদান কেবল ১৯৭১ সালের সশস্ত্র সংগ্রামে সীমাবদ্ধ হয়ে থাকেনি; বর্তমান সময়েও তাঁরা জাতিসত্তার প্রতীক হিসেবে দেশ গঠনে ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অতন্ত্র প্রহরীর ভূমিকায় রয়েছেন। ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের পর জাতীয় ঐক্য ও সম্প্রীতি রক্ষায় বীর মুক্তিযোদ্ধারা গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা পালন করছেন। চলমান বৈষ্যয়িক ও দেশে বিরাজমান প্রতিকুল সময়ে বীর মুক্তিযোদ্ধারা জাতির দিক নির্দেশক এবং তরুণ প্রজন্মের জন্য দেশপ্রেমের অনুপ্রেরণা হয়ে রয়েছেন। ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নারী মুক্তিযোদ্ধা ও প্রথম বিপ্লবী মহিলা ব্যক্তিত্ব বীর কন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার এর স্মৃতিধন্য পটিয়া উপজেলার গৌরবময় ইতিহাস আজও স্মৃতিতে অমলিন। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় বর্তমান প্রজন্মের কাছে ন্যায়-নীতি, মেধা-মননে পরোপকারী ব্যক্তি হিসেবে সুপরিচিত ও অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি পটিয়ার সন্তান বীর গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা ফজল আহমদ। রণাঙ্গনের একজন প্রকৃত যোদ্ধা হিসেবে তিনি বিশ্বাস করেন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ বিনির্মাণের মাধ্যমে বাঙালি জাতির ভৌগলিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি নিহিত। খ্যাতিমান কলামিস্ট ও সুবক্তা হিসেবেও পরিচিত ফজল আহমদ সমাজের ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠা, মানুষের মধ্যে মানবতাবোধ জাগ্রত ও দেশপ্রেমের বার্তা ছড়িয়ে দিতে সচেষ্ট রয়েছেন অবিরত। মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা যাচাই-বাছায়ের মাধ্যমে রণাঙ্গনের প্রকৃত যোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আদায়ে লেখা-লেখি ও সভা-সমাবেশে আলোচনার মাধ্যমে জনমত গঠনে স্বোচ্ছার রয়েছেন তিনি। সমাজের অপশক্তি ও বিভাজনের রাজনীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা রাখতে গিয়ে তিনি অন্তবর্তীকালীন সরকারের পক্ষপাতপুষ্ট নীতির শিকার হয়েছেন একাধিকবার। তিনি শিখেছেন অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকতে এবং মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্মের মাঝে তা ধারণ করার অনুভূতি জাগ্রত করে যাচ্ছেন। শোষণের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্যদিয়ে যারা জীবন বাজি রেখে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিলেন; সেই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের এই অবদানকে স্মরণীয় করে রাখতে নিজ জন্মস্থান পটিয়া ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে সংগঠকের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসগুলোতে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা প্রদান এবং সভা-সমাবেশের মাধ্যমে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মার শান্তি কামনার্থে অনুষ্ঠানাদি পালনে সাংগঠনিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন। অস্বচ্ছল ও অসুস্থ্য মুক্তিযোদ্ধাসহ সমাজে অপেক্ষাকৃত পিছিয়েপড়া মানুষগুলোকে নিয়ে তার ব্যাকুলতার অন্ত নেই। সুযোগ ও সময়মত তিনি তাদের প্রতি সহযোগিতার হাত প্রসারিত রাখেন। সকল ধরণের মানবিক কাজের মাধ্যমে তিনি প্রশান্তি খুঁজে পান।
বীর গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা ফজল আহমদ ১৯৫৫ সালের ১৯ মে পটিয়ার ১৪ নং ধলঘাট ইউনিয়নের তেকোটা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মনোহর আলী ও মাতা ছবুরা খাতুন ছিলেন সৎ, আদর্শবান ও সমাজে সম্মানিত ব্যক্তি। ছোটবেলা থেকেই তিনি মেধাবী, সাহসী ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ ছিলেন। স্থানীয় গৈড়লা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা হয়। পরে গৈড়লা কে.পি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, পটিয়া সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। উচ্চশিক্ষার প্রতি গভীর আগ্রহ থেকে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে চট্টগ্রাম আইন কলেজে আইন বিষয়ে অধ্যয়ন করেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তরুণ ফজল আহমদ দেশের স্বাধীনতার আহ্বানে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি- ছাত্র ইউনিয়নের বিশেষ গেরিলা বাহিনীর সদস্য হিসেবে চট্টগ্রামের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে অংশ নেন। বিশেষ করে ৯ ডিসেম্বরের ঐতিহাসিক যুদ্ধে পাকবাহিনী পরাজিত হয়ে আত্মসমর্পণ করলে চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চল শত্রুমুক্ত হয়, যা স্বাধীনতার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।
বীর গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা ফজল আহমদ স্কুল জীবন থেকেই ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হন। তিনি ১৯৬৭ সাল হতে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী ছিলেন। ১৯৭০ সালে গোপন কমিউনিস্ট পার্টি সাথে যুক্ত হন মেম্বারশীপ পান এবং সমাজতন্ত্রের মূল মন্ত্রে উদ্বোদ্ধ হয়ে সক্রিয়ভাবে পার্টি কাজে অংশগ্রহণ করেন। তিনি পটিয়া থানা ছাত্র ইউনিয়নের নেতা ছিলেন। ৭৫’ পরবর্তী সময়ে ছাত্র ইউনিয়ন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা সংসদের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বর্তমানে চাকুরী জীবন শেষে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এবং মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, প্রাতিষ্ঠানিক কমান্ড চট্টগ্রামের কমান্ডার হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। একইসঙ্গে তিনি ‘মুক্তিযুদ্ধকালিন ন্যাপ- কমিউনিস্ট পার্টি ছাত্র ইউনিয়ন’ বিশেষ গেরিলা বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধা সমন্বয় পরিষদ চট্টগ্রামের সদস্য সচিব এবং বঙ্গবন্ধু সমাজ কল্যান পরিষদ চট্টগ্রাম মহানগরে সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি চট্টগ্রাম প্রাতিষ্ঠানিক বীর মুক্তিযোদ্ধা সমবায় সমিতি লি: চট্টগ্রামের সভাপতি। তিনি আরও অনেক সংগঠনের নেতৃত্বে আছেন।
স্বাধীনতার পর তিনি রাষ্ট্রগঠনের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। কর্মজীবনের শুরুতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষে চাকরি নিলেও পরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে যোগদেন। ১৯৮৩ সালে তিনি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংক-এ যোগদান করেন এবং সততা, দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে যুগ্ম পরিচালক পদ থেকে ২০১৪ সালে অবসর গ্রহণ করেন। কর্মজীবনে তিনি দায়িত্বশীল কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ১৯৮৭ সালে বোয়ালখালী ঘোষখীল গ্রামের সম্ভ্রান্ত পরিবার বাংলাদেশ ডাক বিভাগের কর্মকর্তা মরহুম আবদুল লতিফ এর ১ম কন্যা জেসমিন আরা বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। জেসমিন আরা বেগম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হতে ইসলামের ইতিহাস বিভাগে এম.এস পাশ করেন এবং বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সহকারী জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে বর্তমানে অবসরে রয়েছেন। তাদের চার কন্যা সন্তানের সবাই উচ্চশিক্ষিত ও নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। ১ম কন্যা প্রকৌশলী সাবরিনা বিনতে আহমদ সাকী একজন আই.টি বিশেষজ্ঞ। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি প্রতিষ্ঠানে আইটি বিশেষজ্ঞ হিসেবে তার স্বামী সহ কর্মরত আছেন। ২য় কন্যা ডাক্তার সায়মুনা জেসমিন পিংকি, এম.বিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য), চট্টগ্রাম পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এ কর্মরত আছেন। ৩য় কন্যা প্রকৌশলী ইফফাত বিনতে ফজল (ইমু) আমেরিকান মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটি হতে কম্পিউটার সাইন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার এম.এস করে ১ম শ্রেণিতে ১ম হয়েছেন এবং বর্তমানে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসাবে তার স্বামীসহ কর্মরত। ৪র্থ কন্যা ফারিয়া জেসমিন প্রিমা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজম্যান্টে এমবিএ করছেন।
পারিবারিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি সামাজিক, সাংস্কৃতিকসহ একাধিক মানবিক সংগঠনের সাথে যুক্ত থেকে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় বিশ্লেষণ ধর্মী ফিচার ও কলাম লিখে তিনি খ্যাতিমান লেখক হিসেবে পরিচিতির মধ্যদিয়ে সমাধৃত হচ্ছেন। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম নগরীর পশ্চিম বাকলিয়ায় নিজ বাসভবনে বসবাস করছেন এবং সমাজ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। মুক্তিযুদ্ধের সাহসী যোদ্ধা থেকে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এই দীর্ঘ পথচলায় দেশের প্রতি ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও ত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তার জীবনকাহিনি নতুন প্রজন্মের কাছে দেশপ্রেম, সংগ্রাম ও সততার এক অনন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। সমাজজীবনে সততা, আদর্শ ও নৈতিকতার প্রতিফলনে তিনি একজন অনুকরণীয় ও আলোকিতজন। সংগ্রাম, আদর্শ ও দেশপ্রেমে ভাস্বর এই মানুষটি আমাদের জাতীয় জীবনের এক মূল্যবান সম্পদ। বীর গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা ফজল আহমদের জীবন ও কর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। তাঁর মতো দেশপ্রেমিক মানুষের অবদানই বাংলাদেশের ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধ ও গৌরবান্বিত করেছে।
Editor : Md.Moslauddin (Bahar) Cell: 01919802081 Dhaka Office :: Manni Tower, Road 09,House : 1258 Mirpur Dhaka. Cell:01747430235 email : manobsomoynews@gmail.com Chattogram office :: Lusai Bhaban,( 2nd Floor) Cheragi Pahar Circle, Chattogram. Cell: 01919802081
© All rights reserved manobsomoy